দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন ও ভিসা আইনের জটিলতা।
দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে এশিয়ার অন্যতম উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত থাকলেও, সেখানে কর্মরত সকল প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন সবসময় সহজ নয়। বিশেষ করে ই-৯ (E-9) ভিসাধারী শ্রমিকরা দীর্ঘ সময় ধরে তাদের অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘কোরিয়া হেরাল্ড’-এর একটি প্রতিবেদনে প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর অমানবিক আচরণ এবং কঠোর ভিসা নীতির বিষয়টি উঠে এসেছে।

ভিসা আইনের কঠোরতা ও শ্রমিকদের অসহায়ত্ব ,দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান ভিসা নীতি অনুযায়ী, একজন বিদেশি শ্রমিক চাইলেই তার কর্মস্থল পরিবর্তন করতে পারেন না। বর্তমান ‘এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম’ (EPS) এর আওতায় একজন শ্রমিককে তার মালিকের অধীনেই কাজ করতে হয়। যদি কোনো শ্রমিক মালিকের অন্যায় আচরণ বা নির্যাতনের শিকার হয়ে কাজ ছাড়তে চান, তবে তাকে অবশ্যই বর্তমান মালিকের কাছ থেকে ‘লেটার অফ রিলিজ’ বা রিলিজ লেটার সংগ্রহ করতে হয়। এই আইনটি মালিকদের হাতে এক ধরনের একসাইট ক্ষমতা তুলে দিয়েছে, যা অনেক সময় শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি শ্রমিক রাকিবুল ইসলাম
বাংলাদেশি শ্রমিক রাকিবুল ইসলাম তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, কর্মক্ষেত্রে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। মালিকের হাতে বারবার শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও তিনি চাইলেই চাকরি ছাড়তে পারছিলেন না। তিনি বলেন, “আমি ভেবেছিলাম কোরিয়ান ভাষা ভালোভাবে শিখলে হয়তো এই সমস্যা হবে না, কিন্তু আসলে সমস্যাটি ভাষার নয় বরং সিস্টেমের।” সামান্য ভুলের জন্যও প্রবাসীদের ওপর কঠোর শাসন ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা সেখানে বিরল নয়।
কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি
শুধুমাত্র মানসিক নির্যাতন নয়, কর্মক্ষেত্রে শারীরিক নিরাপত্তার বিষয়টির অভাব অনেক। একজন থাই শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নাড়িভুঁড়িতে গুরুতর আঘাত পেলেও মালিকপক্ষ তাকে যথাযথ চিকিৎসা বা সহযোগিতা প্রদানে বাধা দিয়েছে। অনেক শ্রমিক তাদের আইনি মর্যাদা (Legal Status) হারানো বা দেশে ফেরত পাঠানোর ভয়ে মুখ বুজে সব সহ্য করেন।
আর্থিক বোঝা ও দালাল চক্রের প্রভাব
কোরিয়ায় আসার জন্য অনেক শ্রমিককে বিপুল পরিমাণ টাকা দালালের হাতে দিতে হয়। অনেক শ্রমিক কোরিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রথম এক থেকে দুই বছরের পুরো ইঙ্কামের টাকা ই দালাল বা এজেন্টের খরচ মেটাতে ব্যয় করেন। এই আর্থিক চাপ তাদের এতটাই অসহায় করে দেয় যে, তারা কোনোভাবেই মালিকের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারেন না।
আইন শিথিলের সম্ভাবনা ও শ্রমিকদের দাবি
মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে, শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে কাজ পরিবর্তনের অধিকার দেওয়া উচিত। বর্তমান সরকার এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে এবং ই-৯ (E-9) শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ সম্পন্ন করার পর একই অঞ্চলের মধ্যে কর্মস্থল পরিবর্তনের অনুমতি দেওয়ার কথা ভাবছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত মালিকের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত সমাধান সম্ভব নয়।
দক্ষিণ কোরিয়া যেহেতু একটি উন্নত দেশ এবং সেখানে প্রায় ৩ লক্ষাধিক বিদেশি শ্রমিক কাজ করেন, তাই আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন কোরিয়ার এই শ্রম আইনের দিকে। প্রবাসীদের জন্য “প্রবাস গাইড” সব সময় সঠিক তথ্য প্রদান করে তাদের পাশে থাকতে চায়। কোরিয়া সরকারের উচিত মানবিক দিক বিবেচনা করে এই আইনগুলো সংস্কার করা, যাতে কোনো শ্রমিককে কর্মক্ষেত্রে দাসের মতো জীবন অতিবাহিত করতে না হয়।
তথ্যসূত্রে,কোরিয়া হেরাল্ড
