সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসী ভাইদের কাছে সবথেকে ভীতিকর শব্দটি হলো ‘হুরুব’। হুরুব এমন একটি আইনি জটিলতা যা আপনাকে রাতারাতি একজন বৈধ কর্মী থেকে অবৈধ বা পলাতক আসামিতে পরিণত করতে পারে। অনেক সময় অসাধু কফিল বা কোম্পানিগুলো ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরীহ প্রবাসীদের আকামায় হুরুব লাগিয়ে দেয়। ২০২৬ সালের বর্তমান কড়া আইনের যুগে হুরুব থাকলে আপনি কোনো সরকারি সেবা পাবেন না এবং পুলিশে ধরলে সরাসরি জেল ও দেশে পাঠিয়ে দিবে। আজ আমরা বিস্তারিত জানবো হুরুব আসলে কি, কেন এটি দেওয়া হয়, কীভাবে হুরুব চেক করবেন এবং হুরুব লেগে গেলে তা থেকে বাঁচার আইনি উপায় কী।
হুরুব (Huroob) আসলে কি?
সহজ কথায়, ‘হুরুব’ মানে হলো ‘পলাতক’। সৌদি শ্রম আইন অনুযায়ী, কোনো কর্মী যদি তার কফিল বা কোম্পানির অনুমতি ছাড়া কাজ ছেড়ে পালিয়ে যায় বা দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকে, তবে কফিল সরকারের কাছে রিপোর্ট করে যে এই কর্মী আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। একেই বলা হয় ‘হুরুব’। হুরুব পড়ার সাথে সাথে আপনার আকামা ও ইনস্যুরেন্স বাতিল হয়ে যায় এবং আপনি ওই দেশে অবৈধ হয়ে যান।
আজকের টাকার রেট –আজকের সোনার রেট

হুরুব কেন দেওয়া হয়?
সাধারণত নিচের কারণগুলোতে কফিল হুরুব দিয়ে থাকে:
- কফিলকে না জানিয়ে কাজ ছাড়া: আপনি যদি কোম্পানিকে না বলে অন্য কোথাও কাজ করতে যান।
- মাসিক টাকা না দেওয়া: ফ্রি ভিসার ক্ষেত্রে যদি আপনি কফিলকে চুক্তিমতো মাসিক টাকা (বা ফি) দিতে না পারেন ।
- ব্যক্তিগত শত্রুতা: অনেক সময় কফিল রাগের মাথায় বা ভয় দেখানোর জন্য হুরুব দেয়।
- চুক্তি লঙ্ঘন: আপনি যদি কিউয়া (Qiwa) পোর্টালে থাকা চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেন।
হুরুব চেক করার সঠিক নিয়ম
আপনার নামে হুরুব আছে কি না তা আপনি ঘরে বসেই ২ মিনিটে চেক করতে পারেন:
- শ্রম মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট (MOL): সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল পোর্টালে (mol.gov.sa) যান। সেখানে ‘ইনকোয়ারি সার্ভিস’ থেকে আপনার আকামা নম্বর দিয়ে সার্চ করুন। যদি রেজাল্টে ‘Absent from Work’ লেখা আসে, তবে বুঝবেন আপনার হুরুব লেগেছে। আর যদি ‘On the job’ থাকে, তবে আপনি নিরাপদ।
- আপশার (Absher) অ্যাপ: আপনার আপশার অ্যাকাউন্টে লগইন করে ‘My Dashboard’ এ গিয়ে ‘Iqama Information’ চেক করলে স্ট্যাটাস দেখতে পাবেন।
হুরুব লেগে গেলে করণীয় ও কাটার উপায়
হুরুব লাগলে ভয় না পেয়ে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। ২০২৬ সালের বর্তমান নিয়মে হুরুব কাটার কিছু নির্দিষ্ট পথ রয়েছে:
- ২০ দিনের মধ্যে সমাধান: যদি কফিল ভুল করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে হুরুব দেয় এবং আপনি সেটি ২০ দিনের মধ্যে জানতে পারেন, তবে কফিল কোনো জরিমানা ছাড়াই তার কিউয়া বা আপশার থেকে হুরুব তুলে নিতে পারে।
- শ্রম আদালত (Labor Court): যদি আপনি কোনো অপরাধ না করা সত্ত্বেও কফিল শত্রুতা করে হুরুব দেয়, তবে আপনি ‘মাকতাবুল আমেল’ বা লেবার অফিসে অভিযোগ করতে পারেন। আপনার কাছে যদি বেতন পাওয়ার প্রমাণ বা আপনি যে কাজে উপস্থিত ছিলেন তার প্রমাণ থাকে, তবে সরকার আপনার হুরুব কেটে দেবে।
- কাফালা হওয়া: যদি আপনার হুরুব সঠিক প্রমাণিত না হয় এবং আপনি শ্রম আদালতে জয়ী হন, তবে আপনি কফিলের অনুমতি ছাড়াই অন্য কোম্পানিতে কাফালা (Transfer) হতে পারবেন।
হুরুব থেকে বাঁচার টিপস
- যোগাযোগ রাখা: কফিলের সাথে ঝগড়া করে হঠাৎ কাজ ছাড়বেন না। কাজ ছাড়তে হলে নিয়ম মেনে কাজ ছারুন
- কিউয়া কন্ট্রাক্ট: সবসময় আপনার ডিজিটাল চুক্তিপত্র কিউয়াতে চেক করুন। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কফিল সাধারণত হুরুব দিতে পারে না।
- সঠিক মোবাইল নম্বর: আপশার ও নাফাত অ্যাপে নিজের সঠিক মোবাইল নম্বর দিন যাতে কফিল কোনো অভিযোগ করলে আপনার ফোনে সাথে সাথে এসএমএস আসে।
আবসার বিস্তারিত নাফাত বিস্তারিত
হুরুব প্রবাস জীবনের একটি অভিশাপ, যা আপনার বছরের পর বছর করা পরিশ্রমকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। বিদেশের মাটিতে সবসময় আইনি পথে চলার চেষ্টা করুন এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে জানুন। কফিলের সাথে যেকোনো লেনদেনের রিসিট বা প্রমাণ নিজের কাছে রাখুন। মনে রাখবেন, সচেতনতাই হলো হুরুবের মতো জটিল সমস্যা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। “প্রবাসী গাইড” সব সময় চায় আপনি প্রবাসে নিরাপদ থাকুন এবং বৈধভাবে সম্মানের সাথে কাজ করুন
