ইতালিতে প্রবাসীদের বেতন, কাজের চাহিদা, ওয়ার্ক পারমিট খরচ ও ভিসা চেকিং গাইড
বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম অর্থনৈতিক বড় শক্তি ইতালিতে প্রতি বছর এশিয়া ও মধপ্রাচ্য ও বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার কর্মী পাড়ি জমান সপ্নের দেশ ইতালিতে। কিন্তু ইতালিতে যাওয়ার আগে সেখানকার কাজের পরিবেশ, বাস্তব বেতন কত, আসল খরচ কি এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক জানা থাকা দরকার। আজকে আমরা আলোচনা করবো প্রবাসীদের মনে থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের একদম সহজ ও বাস্তবসম্মত উত্তর জানবো, যা আপনাকে যেকোনো ধরনের জালিয়াতি দালাল থেকে বাঁচতে সাহায্য করবে।
ইতালিতে বেতন কত
প্রথনে জানি ইতালিতে বেতন কেমন হবে । বেতন সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনার কাজের উপড়, অভিজ্ঞতা এবং আপনি কোন শহরে আছেন বা যাবেন তার ওপর। সাধারণ একজন কাজ না জানা বা নতুন কর্মী হিসেবে কৃষিকাজ, রেস্টুরেন্ট বা ক্লিনিং এর কাজে যোগ দিলে প্রতি মাসে গড়ে আপনি ৮০০ থেকে ১,২০০ ইউরো পর্যন্ত পেতে পারেন । যা বাংলা টাকায় ১ লক্ষ ১৭ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার পেতে পারেন । তবে আপনার যদি ভালো কোনো স্কিল বা কাজ জানা থাকে, যেমন ভালো ড্রাইভিং, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার বা কনস্ট্রাকশনের ফোরম্যানের কাজ, তবে প্রতি মাসে ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ ইউরো বা তার বেশি ইনকাম করা সম্ভব।
ইতালি যাওয়ার জন্য কিভাবে আবেদন করতে হবে
ইতালি যাওয়ার জন্য মূলত আপনি দুইভাবে আবেদন করতে পারবেন। আপনি যদি টুরিস্ট ভিসায় যেতে চান, তবে সৌদিতে থাকা ভিএফএস গ্লোবাল বা নির্দিষ্ট ভিসা সেন্টারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিজের প্রয়োজনীয় সমস্ত কাগজপত্র সহ নিজে গিয়ে পাসপোর্ট জমা দিতে হবে। আর আপনি যদি কাজের ভিসায় যেতে চান, তবে ইতালির কোনো বৈধ মালিকের মাধ্যমে সে দেশের ইমিগ্রেশন অপিসে গিয়ে নুলুস্তা এর জন্য আবেদন করতে হবে বা কাজের অনুমতির জন্য । সেখানে আবেদন শেষ হলে আপনার জন্য স্পন্সর বা কাজের পারমিট ইস্যু করবে ।
ইতালিতে ১২ মাসের ভিসা কিভাবে পাওয়া যায়
ইতালিতে বেশির ভাগ সিজনাল কাজের জন্য ৯ থেকে ১২ মাসের এই ধরণের ওয়ার্ক ভিসা দেওয়া হয়ে থাকে। প্রতি বছর ইতালি সরকার যখন ডিক্রেটো ফ্লুসি বা ফ্লুসি ডিক্রির ঘোষণা দেয়, ডিক্রেটো ফ্লুসি হলো একটা চাকরি বা কোটা যা বিদেশিদের কাজের জন্য অনুমতি তখন সেখানে সিজনাল ক্যাটাগরি মানে কৃষি ও হোটেল-ট্যুরিজম খাতের জন্য আলাদা কোটা থাকে। ইতালির কোনো চাষী বা হোটেল মালিক যদি আপনার নামে ইমিগ্রেশন অফিসে স্পন্সরশিপ পেপার জমা দেয় এবং কোটার ভেতর আপনার নাম চলে আসে, তবে আপনি এই ১২ মাসের কাজের ভিসাটি পেয়ে যাবেন।
ইতালির ভিসা করতে কত দিন লাগে
ইতালিতে ভিসার ক্যাটাগরির ওপর ভিত্তি করে সময় কম বা বেশি লাগে। আপনি যদি সৌদি আরব থেকে ইতালির শর্ট-টার্ম বা টুরিস্ট ভিসার জন্য আবেদন করেন, তবে সাধারণত পাসপোর্ট জমা দেওয়ার পর ১৫ থেকে ৩০ দিন বা ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ সময় লাগে। তবে আপনি যদি কাজের ভিসার জন্য নুলাস্তা বা পারমিট হাতে পাওয়ার পর দূতাবাসে পাসপোর্ট জমা দেন, তবে সব কাগজপত্র ও ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন শেষ করে পাসপোর্ট ফেরত পেতে ১ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত সময় লেগতে পারে।
ইতালিতে ২ বছরের ওয়ার্ক পারমিট খরচ কত
ইতালিতে ২ বছরের নন-সিজনাল বা পার্মানেন্ট কাজের ভিসার জন্য সরকারি অফিশিয়াল ফি খুব বেশি একটা নয়। ইতালির নিয়োগকর্তার সরকারি ট্যাক্স এবং দূতাবাসের এই লম্বা প্রসেস ডি ভিসা ফি মোট খরচ প্রায় ২০০ ইউরো থেকে ৩০০ ইউরোর মতো হয়ে থাকে । কিন্তু বাস্তব কথা হলো, কোনো এজেন্সি বা দালালের মাধ্যমে যদি আপনি এই ২ বছরের ওয়ার্ক পারমিট বা নুলাস্তা কিনতে যান, তাহলে দালালের আলাদা চার্জ এবং অন্যান্য চাহিদার কারণে কয়েক লাখ টাকা বা প্রচুর রিয়াল পর্যন্ত দাবি করে, যা সম্পূর্ণ তাদের নিজেদের হাতে থাকে ।
ইতালিতে ৩০০০ ইউরো কি ভালো বেতন
অনেকে জানতে চাইছেন ইতালিতে কি ৩ হাজার ইউর লি ভালো বেতন লি না হ্যাঁ ভাই ইতালির বর্তমান জীবনযাত্রার মান এবং অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী প্রতি মাসে ৩,০০০ ইউরো অনেক উচ্চমানের একটি বেতন। ইতালিতে একজন সাধারণ মানুষের মাসিক থাকা-খাওয়ার খরচ গড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ ইউরোর মধ্যে হয়ে যায়। তাই কেউ যদি প্রতি মাসে ৩,০০০ ইউরো আয় করতে পারেন, তবে তিনি সে দেশে অত্যন্ত বিলাসবহুল ভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন এবং প্রতি মাসে একটি ভালো অংকের টাকা নিজের পরিবার বা দেশে জমা করতে পারবেন।
ইতালি কি ওয়ার্ক ভিসা দিচ্ছে
বর্তমানে ইতালি সরকার তাদের শ্রমবাজারের ঘাটতি পূরণ করার জন্য প্রতি তিন বছরের একটি বড় প্ল্যান বা কোটা ঘোষণা করে থাকে। সেই কোটয় বর্তমান ৩ বছরের মেয়াদে মোট প্রায় ৫ লাখের কাছাকাছি নন-ইউরোপীয় কর্মীকে বৈধ কাজের ভিসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতি বছরই প্রায় দেড় লক্ষাধিক কর্মীকে সিজনাল ও নন-সিজনাল ক্যাটাগরিতে কাজের পারমিট দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে কনস্ট্রাকশন, শিপবিল্ডিং ও ফ্যামিলি কেয়ার ওয়ার্কারদের বড় একটি অংশ রয়েছে।
ইতালি ভিসা পাবো কিভাবে
ইতালির ভিসা পাওয়ার একমাত্র ও প্রধান শর্ত হলো বৈধ উপায়ে সঠিক কাগজপত্র জমা দেওয়া। আপনার টার্গেট যদি হয় টুরিস্ট ভিসা, তবে সৌদিতে আপনার ভালো প্রফেশনের আকামা এবং একটি একটিভ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রেডি করে ভিএফএস গ্লোবালের মাধ্যমে ফাইল জমা দিন। আর টার্গেট যদি হয় কাজের ভিসা, তবে ইতালিতে থাকা কোনো পরিচিত আত্মীয় বা বিশ্বস্ত এজেন্টের মাধ্যমে সেখানকার কোনো আসল কোম্পানির মালিকের সাথে যোগাযোগ করে ডিক্রেটো ফ্লুসির কোটায় আবেদন করিয়ে নুলা ওস্তা সংগ্রহ করতে হবে।
ইতালির ভিসা অনুমোদন হয়েছে কিনা কিভাবে বুঝবেন
আপনার ভিসার আবেদনটি অনুমোদন বা পাস হয়েছে কিনা রিজেক্ট বা বাদ দেওয়া হয়েছে তা জানার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ভিএফএস গ্লোবালের অনলাইন ট্র্যাকিং সিস্টেম। পাসপোর্ট জমা দেওয়ার সময় আপনাকে একটি রেফারেন্স নম্বর বা রসিদ দেওয়া হবে। সেই নম্বর এবং আপনার নামের শেষ অংশ দিয়ে ভিএফএস-এর ওয়েবসাইটে লগইন করলেই দেখতে পারবেন আপনার ফাইলটি এখন কোন অবস্থায় আছে। তবে ভিসা হলো কিনা তা নিশ্চিতভাবে জানা যাবে তখন ই, যখন পাসপোর্টটি আপনার হাতে আসবে এবং আপনি ভেতরে ভিসার স্টিকারটি দেখতে পারবেন।
ভ্রমণ এর ভিসা নিয়ে ইতালি যাওয়া যাবে কি
ইতালিতে ভ্রমণ বা টুরিস্ট এর বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনার কাগজ পত্র কোন দেশ থেকে ইস্যু করেছেনএবং ইতালির সাথে সেই দেশের চুক্তি কেমন। ইউরোপের জন্য কোনো দেশ থেকে ইস্যু করলে সহজে ইতালিতে যাওয়া যায়।আপনি যদি মিডল ইস্ট বা অন্য কোনো অঞ্চলের রিফিউজি ট্রাভেল ডকুমেন্টের ক্ষেত্রে ইতালি যাওয়ার আগে ওই দেশের ইতালিয়ান কনস্যুলেট বা দূতাবাস থেকে বিশেষ ট্রাভেল পারমিট বা এন্ট্রি ভিসা নেওয়া বাধ্যতামূলক, না হলে আপনাকে পড়ে বর্ডারে বা এয়ারপোর্টে আটকে দেওয়া হতে পারে।
ইতালিতে কাজের ভিসা স্পন্সর করতে কত টাকা লাগে
ইতালির কোনো মালিক যখন কোনো বিদেশী কর্মীকে স্পন্সর করতে যান, তখন সরকারিভাবে তার খুব বড় কোনো ফি দেওয়া লাগে না। আবেদন করার সময় কিছু টাকা স্ট্যাম্প বা সরকারি ট্যাক্স দিতে হয়। কিন্তু মূল শর্ত হলো, সেই মালিকের বা কোম্পানির বার্ষিক ভালো আয় থাকতে হবে, যাতে তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে নতুন কর্মীকে নিয়ে এসে প্রতি মাসে বেতন দেওয়ার মতো আর্থিক ক্ষমতা তার কোম্পানির আছে। এই আয়ের যোগ্যতার পেপারস রেডি করতেই মূলত আইনি খরচ হয়ে থাকে। এর বেশি লিছু না ।
ইতালিতে কাজের ভিসা কত বছর লাগে
ইতালির কাজের ভিসা পাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট বয়স বা বছর বা মেয়াদের অপেক্ষা করতে হয় না, বরং এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে লটারি ভাগ্য বলতে পারেন বা কোটার ওপর। তবে একবার কাজের ভিসা নিয়ে ইতালিতে প্রবেশ করার পর আপনার চুক্তির ওপর ভিত্তি করে প্রথম দফায় ১ বছর বা ২ বছরের জন্য রেসিডেন্স পারমিট বা পারমিশন দেওয়া হয়। ইতালিতে টানা ৫ বছর কোনো প্রকার অপরাধ ছাড়া বৈধভাবে কাজ এবং ঠিকমত ট্যাক্স পরিশোধ করলে স্থায়ীভাবে বসবাসের কার্ড বা পিআর (PR) এর জন্য আবেদন করতে পারবেন।
ইতালি সিজনাল ভিসা পেতে কতদিন লাগে
ইতালির সিজনাল বা মৌসুমী কাজের ভিসার প্রক্রিয়াটি সাধারণত অন্যান্য ভিসার চেয়ে কিছুটা তাড়াতাড়ি হয়। প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট সময়ে ইতালির মালিকরা যখন স্পন্সরশিপের জন্য ক্লিক ডে-তে ফরম জমা দেন, তারপর থেকে সাধারণত ২ থেকে ৪ মাসের মধ্যে ইমিগ্রেশন অফিস থেকে নুলা ওস্তা বা পারমিট পেপার ইস্যু করা হয়। সেই পারমিট হাতে পাওয়ার পর সৌদিতে বা নিজ দেশে অবস্থিত দূতাবাসে পাসপোর্ট জমা দিলে সাধারণত ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে সিজনাল ভিসাটি পাসপোর্টের পাতায় যুক্ত হয়ে যায়।
ইতালিতে কোন কাজের চাহিদা বেশি
বর্তমান সময়ে ইতালিতে কয়েকটি নির্দিষ্ট পদে কর্মীর অনেক অভাব রয়েছে এবং এই পদ গুলোতেই সবচেয়ে বেশি লোক নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো কনস্ট্রাকশন বা বিল্ডিং নির্মাণ কাজ, কৃষি কাজ ডে-লেবার, হোটেল ও রেস্তোরাঁর ওয়েটার বা শেফ, কার্গো ও লরি ড্রাইভিং এবং বাসাবাড়ি বা হাসপাতালের জন্য বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের দেখাশোনা করার জন্য ফ্যামিলি কেয়ার গিভার বা নার্সিংয়ের কাজ। এই কাজগুলো জানা থাকলে ইতালিতে খুব দ্রুত চাকরি পাওয়া যায়।
১ বছরের স্টুডেন্ট ভিসার দাম কত
ইতালি সরকারের অফিশিয়াল শিক্ষা নিয়ম অনুযায়ী, পড়াশোনার উদ্দেশ্যে ইতালিতে আসার জন্য স্টুডেন্ট বা স্টাডি ভিসার কোনো সরকারি কোন এন্ট্রি ফি নেওয়া হয় না, এটি সম্পূর্ণ ফ্রি। তবে ১ বছরের স্টুডেন্ট ভিসা পাওয়ার জন্য আপনাকে ইতালির কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ থেকে অফার লেটার পেতে হবে। এর পাশাপাশি আপনার বা আপনার অভিভাবকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ইতালিতে ১ বছর চলার মতো পর্যাপ্ত টাকা (ব্লকড অ্যামাউন্ট বা স্পন্সরশিপ) দেখাতে হবে এবং শিক্ষা সংক্রান্ত সকল পেপারস বোর্ড থেকে সত্যায়িত করার খরচ বহন করতে হবে।
শেষ কথা
ইউরোপের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য শর্টকাট কোনো রাস্তা খোঁজা মানে বোকামি। ইতালিতে কাজের অনেক সুযোগ রয়েছে, তবে তার জন্য আপনাকে সঠিক সময়ে সঠিক আইনি প্রক্রিয়া মেনে পা বাড়াতে হবে এবং খোজ খবর রাখতে হবে। দালালের কথায় ফাঁদে পা দিয়ে নিজের কষ্টের রিয়াল বা টাকা নষ্ট করবেন না।
প্রবাসীদের কর্মসংস্থান, বিভিন্ন দেশের ভিসা গাইড এবং আকামার নিত্যনতুন ও সঠিক আপডেট সবার আগে পেতে সবসময় সাথে থাখুন আমাদের প্রবাস গাইড (Probash Guide) ওয়েবসাইট।

