সৌদি আরব থেকে ইতালি যাওয়ার উপায়: ভিসা প্রসেস, খরচ ও সম্পূর্ণ গাইডলাইন
বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত লক্ষ লক্ষ প্রবাসী ভাইদের মধ্যে অনেকেরই স্বপ্ন থাকে ইউরোপের কোনো উন্নত দেশে পাড়ি যাওয়ার বা স্যাটাল হওয়ার। অনেকে আসেন মধ্যপ্রায়ে ইতালি বা ইউরোপ সহজে যাওয়ার জন্য আর এই স্বপ্নের দেশগুলোর তালিকায় সবার ওপরে থাকে ইতালি। বাংলাদেশ থেকে আবেদন করার চেয়ে সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইতালির ভিসার জন্য চেষ্টা করলে সফলতা পাওয়ার সুযোগ অনেক বেশি থাকে। কিন্তু সঠিক তথ্য না জানার কারণে অনেকেই দালালের ফাধে পড়ে লাখ লাখ টাকা ক্ষতি করেন । আজকে আমরা প্রবাসীদের মনে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১৫টি প্রশ্নের একদম সহজ এবং আইনি উত্তর জানবো, যাতে আপনি নিজেই নিজের ফাইল প্রসেস করতে পারেন।
সৌদি থেকে ইতালি কিভাবে যাওয়া যায়
সৌদি আরব থেকে ইতালিতেআপনি দুই ভাবে যেতে পারেন । একটি হলো ইতালির টুরিস্ট বা ভিজিট ভিসা, যেটিকে শর্ট-টার্ম শেঞ্জেন ভিসাও বলা হয়। আর দ্বিতীয়টি হলো ইতালির কাজের ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট। আপনি যদি সৌদিতে কোনো ভালো কোম্পানিতে বা ভালো পেশায় কাজ করেন এবং আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নিয়মিত লেনদেন থাকে, তবে আপনি টুরিস্ট ভিসার জন্য আবেদন করতে পারেন। আর যদি আপনি কোনভাবে ইতালির কোনো কোম্পানির মালিকের কাছ থেকে আপনি একটি স্পন্সরশিপ বা কাজের পারমিট লেটার জোগাড় করতে পারেন, তবে কাজের ভিসা নিয়ে ইতালিতে যেতে পারবেন।
সৌদি থেকে ইতালি যাওয়ার সহজ উপায়
সৌদি প্রবাসীদের জন্য ইতালিতে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় এবং খুব দ্রুত উপায় হলো শেঞ্জেন টুরিস্ট ভিসা। কাজের ভিসার জন্য ইতালি সরকারের স্পন্সরশিপ কোটার ওপর নির্ভর করতে হয়, যা বেশ জটিল এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু টুরিস্ট ভিসার ক্ষেত্রে আপনার যদি একটি বৈধ আকামা, আপনার কফিল বা কোম্পানির একটি ছুটির চিঠি এবং গত ৬ মাসের একটি পরিষ্কার ব্যাংক স্টেটমেন্ট থাকে, তবে আপনি নিজেই ভিসা সেন্টারে আবেদন করে খুব সহজে ভিসা পেয়ে যেতে পারেন। এই ভিসার রিজেকশন রেটও অনেক কম থাকে।
সৌদি থেকে ইতালি কত কিলোমিটার
সৌদি আরব থেকে ইউরোপের দূরত্ব কিন্তু খুব বেশি একটা দূরে নয়। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ শহর থেকে ইতালির রাজধানী রোম শহরের আকাশপথের সোজা দূরত্ব প্রায় ৩,৯৫৪ কিলোমিটার। আপনি যদি জেদ্দা থেকে হিসাব করেন, তবে এই দূরত্ব আরও কিছুটা কমে যায় এবং এটি প্রায় ৩,৩০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি দাঁড়ায় যা বাংলাদেশের চেয়েও কম দূরত্ব। এই কম দূরত্বের কারণে প্রবাসীদের জন্য যাতায়াত বেশ সুবিধাজনক।
সৌদি থেকে ইতালি
সৌদি থেকে ইতালি যাওয়ার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক উন্নত ও আধুনিক। সৌদি আরবের প্রধান দুটি বিমানবন্দর জেদ্দা এবং রিয়াদ থেকে ইতালির রোম এবং মিলান শহরের উদ্দেশ্যে সরাসরি ফ্লাইট রয়েছে। সৌদি এয়ারলাইন্স, উইজ এয়ার এবং কাতার এয়ারওয়েজের মতো বড় বড় বিমান সংস্থাগুলো এই রুটে নিয়মিত যাতায়াত করে। আকাশপথে সরাসরি ফ্লাইটে সৌদি থেকে ইতালি পৌঁছাতে মাত্র ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় লাগে।
সৌদি থেকে ইতালি কত টাকা লাগে
সৌদি থেকে ইতালি টাকার হিসেব করতে গেলে প্রথমে ভিসার ধরন এবং আপনি কোন মাধ্যমে যাচ্ছেন, তার ওপর ভিত্তি করে খরচের পরিমাণ ঠিক হয়। আপনি যদি কোনো দালালের কাছে না গিয়ে নিজে সরাসরি সরকারি নিয়ম মেনে টুরিস্ট ভিসার আবেদন করেন, তবে ইন্স্যুরেন্স, সরকারি ফি এবং ভিসা সেন্টারের চার্জ মিলিয়ে ১,২০০ থেকে ১,৫০০ সৌদি রিয়ালের মতো খরচ হবে। তবে আপনি যদি ইতালির কাজের ভিসা বা কোনো এজেন্সির মাধ্যমে পুরো ফাইল প্রসেস করাতে যান, তবে সেই খরচ বিমান টিকিট ও তাদের সার্ভিস চার্জসহ আরও অনেক বেড়ে যাবে। যা ৫ থেকে ৬ হাজার হতে পারে।
সৌদি থেকে ইতালি টুরিস্ট ভিসা
এটি একটি শর্ট-টার্ম বা সি-টাইপ ভিসা, যা দিয়ে আপনি ইতালিসহ ইউরোপের মোট ২৭টি শেঞ্জেন দেশে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারবেন। এই ভিসার জন্য আবেদনের মূল শর্ত হলো আপনার আকামার মেয়াদ নিম্নে ৩ মাস থাকতে হবে, পাসপোর্টের মেয়াদ ৬ মাস থাকতে হবে, কোম্পানির একটি এনওসি লেটার লাগবে এবং একটি আন্তর্জাতিক ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স থাকতে হবে। এই ভিসার বড় সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে ইউরোপের পরিবেশ নিজের চোখে আপনি দেখে আসতে পারবেন এবং পরবর্তীতে বড় বা কোন কাজের ভিসার জন্য পথ সহজ হয়।
ইতালিতে প্রবাসীদের বেতন, কাজের চাহিদা, ওয়ার্ক পারমিট খরচ ও ভিসা চেকিং গাইড
নিত্য প্রয়োজনীয় ইটালি ভাষা শিক্ষা পর্ব ১ বাংলা উচ্চারণসহ
আপনার আকামায় কয়টি সিম আছে? সৌদি আরবে অবৈধ সিম চেক করা এবং বন্ধ করার পূর্ণাঙ্গ গাইড ২০২৬
সৌদি থেকে ইতালি কিভাবে যাবো
আপনি যদি নিজে আবেদন করতে চান, তবে প্রক্রিয়াটি কইয়েকটী ধাপ আছে সেই ধাপে ধাপে ধাপে সম্পন্ন করতে হবে। প্রথমে ইতালির অফিশিয়াল ভিসা আবেদন ফর্মটি অনলাইনে নির্ভুলভাবে পূরণ করতে হবে। এরপর সৌদি আরবে অবস্থিত ভিএফএস গ্লোবাল এর ওয়েবসাইট থেকে একটি তারিখ বুক করতে হবে। নির্ধারিত তারিখে আপনার পাসপোর্ট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট, হোটেল বুকিং এবং ফ্লাইট টিকিট নিয়ে ভিসা সেন্টারে সশরীরে নিজে গিয়ে হাজির হতে হবে। সেখানে আপনার আঙুলের ছাপ নেওয়া হবে এবং ভিসা ফি জমা দিতে হবে।
সৌদি আরব থেকে ইতালি ভিসার দাম কত
ইতালি সরকারের অফিশিয়াল নিয়ম অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য শেঞ্জেন টুরিস্ট ভিসার সরকারি ফি হলো ৮০ ইউরো, যা সৌদি রিয়ালে কনভার্ট করলে প্রায় ৩৩০ থেকে ৩৫০ রিয়ালের মতো দাঁড়ায়। আর শিশুদের জন্য এই ফি ৪০ ইউরো। তবে এর সাথে ভিসা সেন্টারের নিজস্ব সার্ভিস চার্জ হিসেবে আরও প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ রিয়াল অতিরিক্ত যুক্ত হতে পারে।
ইতালি ভিসার খরচ কত
সরকারি মূল ফি-র বাইরেও কিছু ছোট খাটো খরচ রয়েছে যা আপনাকে মাথায় রাখতে হবে। যেমন মেডিকেল বা ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্সের জন্য প্রায় ১০০ রিয়াল, ছবি ও কাগজ পত্রের ইংরেজি অনুবাদ করার জন্য ৫০ রিয়াল এবং যাওয়া-আসার ডামি বিমান টিকিট ও হোটেল বুকিং কনফার্মেশনের জন্য ১০০ থেকে ১৫০ রিয়াল। সব মিলিয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ রিয়ালের অতিরিক্ত খরচের মধ্যে সমস্ত পেপারস রেডি করা সম্ভব।
সৌদি নাগরিকদের কি ইতালি যেতে ভিসা লাগে
হ্যাঁ, আপনি বাংলাদেশী নাগরিক হোন কিংবা সৌদি রেসিডেন্ট, সৌদি আরব থেকে ইতালি যেতে হলে আপনাকে অবশ্যই আগে থেকে ভিসা নিতে হবে। অনেকে মনে করেন সৌদির আকামা থাকলে হয়তো সরাসরি ইতালিতে যাওয়া যায়, কিন্তু এটি ভুল ধারণা। তবে সৌদির আকামা থাকার কারণে আপনি সৌদি আরবে অবস্থিত ইতালিয়ান দূতাবাস বা ভিসা সেন্টারে সরাসরি আবেদন করার বিশেষ সুযোগ পাবেন, যা বাংলাদেশ থেকে আবেদনের চেয়ে অনেক বেশি সহজ।
সৌদি আরব থেকে ইতালি ওয়ার্ক ভিসার জন্য কিভাবে আবেদন করব
আপনি যদি সৌদি আরব থেকে ইতালি যেতে চান সেই কাজের ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে ইতালির নিয়োগকর্তা বা মালিকের ওপর। প্রথমে ইতালির কোনো কোম্পানির মালিককে আপনার কাজের যোগ্যতা দিয়ে রাজী করাতে হবে যে আপনি কি কাজ পারেন কেন আপনি যাবেন কি কাজ করতে ইতালি যাবেন । সেই মালিক ইতালির স্থানীয় ইমিগ্রেশন অফিস থেকে আপনার নামে একটি নুলা ওস্তা বা ওয়ার্ক পারমিট বের করবেন। মালিক যখন সেই নুলা ওস্তার আসল কপি আপনাকে সৌদিতে পাঠাবে, তখন আপনি সেই পেপার এবং আপনার সৌদি আকামা নিয়ে সৌদিতে অবস্থিত ভিএফএস সেন্টারে কাজের ভিসার জন্য পাসপোর্ট জমা দিতে পারবেন।
আমি কি ৩ দিনের মধ্যে শেঞ্জেন ভিসা পেতে পারি
বাস্তবসম্মত এবং আইনি উত্তর হলো না, যেতে পারবেন না সাধারণ প্রবাসীদের জন্য ৩ দিনের মধ্যে ইতালির শেঞ্জেন ভিসা পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কোনো বিশেষ কূটনৈতিক বা মারাত্মক জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়া দূতাবাস এত দ্রুত ভিসা ইস্যু করে না। সাধারণ নিয়মে ইতালির ভিসা প্রসেস হতে সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ৩০ দিন সময় লাগে। তাই ৩ দিনে ভিসা দেওয়ার কথা বলে কোনো দালাল যদি আপনার কাছে বড় অংকের টাকা দাবি করে, তবে নিশ্চিত থাকবেন সেটি সম্পূর্ণ প্রতারণা।
শেষ কথা
ইউরোপের ভিসা পাওয়ার জন্য কোনো অলৌকিক আলদিনের জাদুর চেরাগ না বা দালালের গোপন কোনো রাস্তা নেই। আপনার কাগজপত্র যত পরিষ্কার, আসল এবং আইনি হবে, আপনার ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি থাকবে। অযথা দালালের পেছনে লাখ লাখ টাকা নষ্ট না করে নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট উন্নত করুন এবং সঠিক নিয়মে নিজেই আবেদন করুন।
প্রবাসীদের ভিসা, আকামা এবং বিভিন্ন দেশের আইনকানুনের এমন নিখুঁত ও বাস্তব গাইডলাইন প্রতিদিন পেতে চোখ রাখুন আমাদের প্রবাস গাইডে

