হেবা দলিল কী? রক্তসম্পর্কের আত্মীয়দের মাঝে জমি দান ও হেবা দলিল করার সম্পূর্ণ নিয়ম ও খরচ
হেবা দলিল কী
বাংলাদেশে সম্পত্তি হস্তান্তর বা মালিকানা পরিবর্তনের বিভিন্ন আইনি মাধ্যম রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ও সাশ্রয়ী মাধ্যম হলো ‘হেবা দলিল’ বা দানপত্র দলিল। ইসলামী শরিয়াহ আইন এবং প্রচলিত বাংলাদেশি আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি তার নিজের ইচ্ছায় ও সুস্থ মস্তিষ্কে কোনো প্রকার আর্থিক মূল্য বা প্রতিদান ছাড়াই যখন নিজের সম্পত্তি রক্তসম্পর্কের নির্দিষ্ট কিছু আত্মীয়কে মালিকানা হস্তান্তর করেন, তাকে হেবা বা দান বলা হয়। সাধারণ ক্রয়-বিক্রয় দলিলের ক্ষেত্রে উচ্চহারে রেজিস্ট্রেশন ফি ও কর প্রদান করতে হলেও, হেবা দলিলের ক্ষেত্রে সরকার বিশেষ ছাড় ও নামমাত্র খরচে দলিল রেজিস্ট্রি করার আইনি সুযোগ দিয়েছে। পরিবার বা নিকটাত্মীয়ের মধ্যে জমি হস্তান্তর বা উইল ছাড়া সম্পত্তি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে হেবা দলিলের সঠিক নিয়ম জানা অত্যন্ত জরুরি।
তবে সাধারণ দান এবং আইনি হেবা দলিলের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। পূর্বে মৌখিকভাবে বা সাধারণ স্ট্যাম্পে হেবা করা গেলেও, পরবর্তীতে দালালি এবং জালিয়াতি রোধ ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার নির্দিষ্ট রক্তসম্পর্কের আত্মীয়দের মধ্যে হেবা দলিল রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক করেছে। হেবা দলিল করার ক্ষেত্রে আইনগতভাবে কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত ও নিয়মাবলী মেনে চলতে হয়।
আরো পড়ুন – খতিয়ানে জমির হিস্যার ভাগ: আনা, গণ্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিলের হিসাব বোঝার সহজ নিয়ম
বাংলাদেশে জমি ক্রয়ের পূর্বে সঠিক জমি চেনার উপায় ও আইনি কাগজপত্র যাচাইয়ের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
হেবা দলিল কী? রক্তসম্পর্কের আত্মীয়দের মাঝে জমি দান ও হেবা দলিল করার সম্পূর্ণ নিয়ম ও খরচ
কাদের মধ্যে হেবা দলিল করা যায়
আইন অনুযায়ী সব আত্মীয়ের মধ্যে হেবা দলিলের কম খরচের সুবিধা পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু রক্তসম্পর্কের নিকটাত্মীয়ের মধ্যেই হেবা দলিল সম্পাদন করা সম্ভব। সম্পর্কের এই পরিধি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট:
পিতা/মাতা এবং ছেলে/মেয়ের মধ্যে।
স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে।
আপন ভাই ও আপন বোনের মধ্যে।
দাদা/দাদি কিংবা নানা/নানির সাথে নাতি/নাতনির মধ্যে।
উল্লিখিত সম্পর্কের বাইরে অন্য কোনো দূরসম্পর্কের আত্মীয় বা বন্ধু-বান্ধবকে এই কম খরচে হেবা দলিল দেওয়া যায় না; তাদের ক্ষেত্রে সাধারণ দানপত্র বা সাব-কবলা দলিলের নিয়ম প্রযোজ্য হয়।
হেবা দলিলের সরকারি খরচ ও ফি:
সাধারণ সাফ-কবলা দলিলের মতো হেবা দলিলে কয়েক শতাংশ ফি দিতে হয় না। সরকার নির্ধারিত অত্যন্ত নমনীয় ও কম খরচে হেবা দলিল রেজিস্ট্রি করা যায়:
রেজিস্ট্রেশন ফি: নামমাত্র ১০০ টাকা (রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ এর ধারা অনুযায়ী)।
স্ট্যাম্প শুল্ক: ২০০ টাকা (স্ট্যাম্প আইন অনুযায়ী)।
এছাড়া দলিলের সাথে সংযুক্ত করার জন্য ২০০ টাকার স্ট্যাম্পে একটি আইনি হলফনামা (Affidavit), ই-ফি ১০০ টাকা এবং দলিল লেখার খরচ বা কার্টিজ পেপারের খরচ বহন করতে হয়। ফলে মাত্র কয়েক হাজার টাকার মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
হেবা দলিল সম্পাদনের আইনি ধাপসমূহ
হেবা দলিল সম্পন্ন করার জন্য সাধারণ দলিলের মতো কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়:যেমন
দলিল ড্রাফটিং বা খসড়া তৈরি: প্রথমে একজন অভিজ্ঞ দলিল লেখক বা আইনজীবীর মাধ্যমে দলিলের বিষয়বস্তু, জমির বিবরণ, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর এবং দাতা ও গ্রহীতার সঠিক বিবরণ উল্লেখ করে খসড়া তৈরি করতে হবে।
দলিল রেজিস্ট্রেশন: দাতা ও গ্রহীতা উভয়পক্ষ সশরীরে উপস্থিত হয়ে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে বায়োমেট্রিক টিপসই ও ছবি দিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করবেন। হেবা দলিল একবার রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে তা সাধারণত একতরফাভাবে বাতিল করা যায় না।
হেবা দলিল রেজিস্ট্রেশনপর করণীয় (ই-নামজারি)
হেবা দলিল সম্পন্ন করাই মূল কাজ নয়; দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার পর অবশ্যই দ্রুততম সময়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসে অনলাইনে ই-নামজারি আবেদন করতে হবে। নতুন গ্রহীতার নামে খতিয়ান বা পরচা আপডেট না হলে ভবিষ্যতে ওই জমির ওপর পূর্ণ আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। নামজারি করার সময় সরকারি নির্ধারিত ফি (১,১৭০ টাকা) পরিশোধ করে নতুন ডি.সি.আর ও খতিয়ান সংগ্রহ করতে হবে।
পৈতৃক সম্পত্তি ভাই-বোনদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া কিংবা পিতা-মাতা জীবিত অবস্থায় সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার ক্ষেত্রে হেবা দলিল হলো সবচেয়ে নিরাপদ ও আইনসম্মত মাধ্যম। সঠিক কাগজপত্র ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হেবা দলিল করলে ভবিষ্যতে কোনো পারিবারিক বিরোধ বা আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয় না।

