জমির বায়না করার পর জমি দলিল করে না দিলে আইনি প্রতিকার ও করণীয়
বাংলাদেশে ভূ-সম্পত্তি কেনাবেচার সময় বিক্রেতাকে অগ্রিম টাকা দিয়ে ‘বায়নাপত্র দলিল’ সম্পাদন করা অত্যন্ত সাধারণ একটি আইনি প্রক্রিয়া। সাধারণত চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাকি টাকা পরিশোধ করে মূল ‘সাব-কবলা দলিল’ রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার কথা থাকে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, ক্রেতা নির্দিষ্ট সময়ে অবশিষ্ট টাকা দিতে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও বিক্রেতা টালবাহানা শুরু করেন, চুক্তি ভঙ্গ করেন কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে বেশি দামে জমি বিক্রির চেষ্টা চালান। জমি বায়না করার পর বিক্রেতা জমি রেজিস্ট্রি বা দলিল করে না দিলে হতাশ না হয়ে আইনের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট আইনি প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।
জমির বায়না করার পর জমি দলিল করে না দিলে কি করবেন
রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ এবং সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭ অনুযায়ী বায়নাপত্র দলিল রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক। যদি কোনো বায়নাপত্র দলিল আইনগতভাবে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত থাকে, তবে বিক্রেতা একতরফাভাবে তা বাতিল বা জমি বিক্রি করতে অস্বীকার করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে ক্রেতার অধিকার রক্ষায় আইনগত যে ৪টি ধাপ অনুসরণ করতে হয়, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ধাপ ১: আইনি নোটিশ প্রেরণ
বায়না দলিলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে বা মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে বিক্রেতাকে একটি রেজিস্টার্ড ‘আইনি নোটিশ’ বা লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে হবে। নোটিশে উল্লেখ করতে হবে যে—ক্রেতা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অবশিষ্ট টাকা প্রদান করে জমি দলিল করে নিতে প্রস্তুত আছেন এবং নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত হয়ে দলিল সম্পাদন করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এই লিগ্যাল নোটিশ পরবর্তীতে আদালতে মামলার মূল দলিল বা প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
আরো পড়ুন-জমি কেনার পূর্বে বায়া দলিল যাচাই করার সঠিক নিয়ম ও আইনি পদ্ধতি
জমি রেজিস্ট্রেশনের সকল দলিল কত প্রকার ও কি কি? বিস্তারিত আইনি গাইডলাইন
সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান চেনার সহজ উপায় ও অনলাইন যাচাই পদ্ধতি
ধাপ ২: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনে চুক্তি বাস্তবায়নের মামলা
যদি বিক্রেতা আইনি নোটিশ পাওয়ার পরও জমি রেজিস্ট্রি করে দিতে রাজি না হন, তবে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭-এর ১২ ধারা অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতে ‘চুক্তি প্রবল বা চুক্তি বাস্তবায়নের মামলা’ দায়ের করতে হবে। বায়না দলিলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে বা বিক্রেতা চুক্তি বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি জানানোর তারিখ থেকে ১ বছরের মধ্যে দেওয়ানি আদালতে এই মামলা দায়ের করা বাধ্যতামূলক। আদালত যদি দেখতে পান যে ক্রেতা তার শর্ত পূরণ করেছেন, তবে আদালত বিক্রেতাকে জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার নির্দেশ দেবেন। বিক্রেতা আদালতে উপস্থিত না হলে বা অস্বীকার করলে আদালত নিজেই ক্রেতার নামে দলিল রেজিস্ট্রি করে দেবেন।
ধাপ ৩: জমি বিক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা স্থগিতাদেশ
মামলা চলাকালীন বিক্রেতা যেন থার্ড পার্টি বা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে উক্ত জমি বিক্রি, হস্তান্তর বা বন্ধক রাখতে না পারেন, সেজন্য দেওয়ানি কার্যবিধি (CPC) অনুযায়ী আদালতে ‘অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা’ বা স্থগিতাদেশের আবেদন করতে হবে। আদালত স্থগিতাদেশ দিলে বিক্রেতা মামলা চলাকালে জমি হাতবদল করতে পারবেন না।
ধাপ ৪: ফৌজদারি প্রতারণার মামলা
বিক্রেতা যদি বায়নার টাকা গ্রহণ করে প্রতারণামূলকভাবে একই জমি অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দেন বা জালিয়াতির আশ্রয় নেন, তবে দেওয়ানি মামলার পাশাপাশি পেনাল কোড-এর ৪২০ ও ৪০৬ ধারা অনুযায়ী বিচারক হাকিম আদালতে সিআর প্রতারণার মামলা রুজু করা যায়।
জমি বায়না করার সময় অবশ্যই রেজিস্টার্ড বায়নাপত্র দলিল সম্পাদন করা উচিত এবং নোটারী পাবলিক বা স্ট্যাম্পে অলিখিত বায়না সবসময় এড়িয়ে চলা উচিত। আইনের সঠিক বিধান জানা থাকলে ও নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে পদক্ষেপ নিলে কোনো বিক্রেতাই বায়নার টাকা আত্মসাৎ বা জমি দলিল করে না দিয়ে পার পেতে পারে না।

