জমি নামজারি বা মিউটেশন কি? অনলাইনে ই-নামজারি আবেদনের সঠিক নিয়ম
জমি ক্রয়ের পর দলিল রেজিস্ট্রি করা হলেও যতক্ষণ না পর্যন্ত নতুন ক্রেতা তার নিজের নামে ‘নামজারি’ বা ‘মিউটেশন’ (Mutation) সম্পন্ন না করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব রেকর্ডে তার মালিকানা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। জমি হস্তান্তরের পর পূর্ববর্তী মালিকের নাম কেটে দিয়ে সরকারি রেজিস্টার বা খতিয়ানে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আইনি প্রক্রিয়াকেই বলা হয় নামজারি। বাংলাদেশ ভূমি আইনের দৃষ্টিতে নামজারি না করা জমি আইনিভাবে দুর্বল এবং তা বিক্রি বা বন্ধক রাখার ক্ষেত্রে চরম বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
আর পড়ুন-সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান চেনার সহজ উপায় ও অনলাইন যাচাই পদ্ধতি
১ শতাংশ জমি কতটুকু? শতাংশ, কাঠা ও স্কয়ার ফিটে জমি পরিমাপের সহজ হিসাব
বাংলাদেশে জমি ক্রয়ের পূর্বে সঠিক জমি চেনার উপায় ও আইনি কাগজপত্র যাচাইয়ের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
নামজারি করার প্রধান উদ্দেশ্য হলো ভূমির মালিকানার স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা। যখন কোনো ব্যক্তি ক্রয়, দান বা উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিক হন, তখন তাকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসের মাধ্যমে স্বত্ব নথি সংশোধন করতে হয়। নামজারি সম্পন্ন হলে নতুন ক্রেতার নামে একটি আলাদা ‘জমাভাগ খতিয়ান’ তৈরি হয় এবং নির্দিষ্ট হোল্ডিং নম্বর বরাদ্দ করা হয়। এর ফলে ওই জমির জন্য অন্য কেউ দাবি উত্থাপন করতে পারে না এবং জমির খাজনা নতুন মালিকের নামে জমা হতে থাকে।
বর্তমানে বাংলাদেশে নামজারি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল বা ‘ই-নামজারি’ (e-Mutation) মাধ্যমে পরিচালিত হয়। অনলাইনে আবেদন করতে হলে Land Services Portal (mutation.land.gov.bd)-এ গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হয়। আবেদনের সময় মূল রেজিস্ট্রি দালিল, ভায়া দলিল, পূর্ববর্তী খতিয়ানের কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র (NVD), পাসপোর্ট সাইজ ছবি এবং হাল সন পর্যন্ত পরিশোধিত খাজনার রশিদের (দাখিলা) স্ক্যান কপি আপলোড করতে হবে। আবেদন সাবমিটের পর নির্ধারিত কোড নম্বর ও ট্র্যাকিং নম্বর পাওয়া যাবে, যার মাধ্যমে আবেদনের বর্তমান অগ্রগতি মোবাইল ফোনে মেসেজের মাধ্যমে জানা যায়।
অনলাইনে আবেদন দাখিলের পর এসি ল্যান্ড অফিস থেকে নথিটি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার)-এর কাছে তদন্তের জন্য পাঠানো হয়। তহশিলদার সরেজমিনে জমির সীমানা ও স্বত্ব পরীক্ষা করে প্রতিবেদন জমা দিলে উভয় পক্ষকে শুনানির জন্য ডাকা হয়। শুনানিতে মূল নথিপত্র প্রদর্শন করার পর সবকিছু সঠিক থাকলে এসি ল্যান্ড নামজারির অনুমোদন প্রদান করেন। অনুমোদনের পর সরকার নির্ধারিত ফি অনলাইনে পরিশোধ করলেই আবেদনকারী তার আইডি থেকে নামজারি খতিয়ান ও ডি-সি-আর (DCR) ডাউনলোড ও প্রিন্ট করে নিতে পারেন।
নামজারি না করার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো প্রতারণার শিকার হওয়া। নামজারি না থাকলে অসাধু বিক্রেতা একই জমি অন্য কারও কাছে পুনরায় বিক্রি করে দিতে পারে অথবা ওই জমি ব্যাংক ঋণের জন্য ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া নামজারি ছাড়া সরকারি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই জমি কেনার রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হওয়ার পরপরই বিলম্ব না করে ই-নামজারির জন্য আবেদন করা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।

