প্রবাসে থেকে স্ত্রীকে আইনিভাবে তালাক দেওয়ার উপায়: পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও সহজ প্রসেস
বিদেশে বসে স্ত্রীকে আইন-গতভাবে কিভাবে তালাক দিবেন এবং দেওয়ার নিয়ম কি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সত্যায়ন ও দেনমোহর পরিশোধের সঠিক গাইডলাইন জেনে নিন।
পরিবারের হাসি ফুটানোর জন্য উন্নত ভবিষ্যতের আশায় প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি বিদেশে পাড়ি জমান। পরিবার-পরিজন ছেড়ে এই দূর প্রবাসের কঠিন জীবনে মানিয়ে নেওয়া যেমন অনেক কঠিন, তেমনি বহু দূরে অবস্থান করার কারণে অনেক সময় দাম্পত্য জীবনে অশান্তি টানাপড়া বা চরম মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। বনিবনা না হওয়া, পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব কিংবা অন্যান্য পারিবারিক সমস্যার কারণে যখন দাম্পত্য জীবন রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন অনেক প্রবাসী ভাই আইনি বিচ্ছেদের (তালাক) সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
তবে প্রবাসে অবস্থানকালে দেশে না এসে কীভাবে আইনিভাবে তালাক দেওয়া সম্ভব, তা নিয়ে সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক প্রবাসী চরম বিভ্রান্তি ও মানসিক দুশ্চিন্তায় ভোগেন। মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১ অনুযায়ী বিদেশে বসেও সম্পূর্ণ বৈধ ও সরকারি নিয়মে তালাক প্রদান করা সম্ভব। এই নিবন্ধে প্রবাস থেকে স্ত্রীকে আইনিভাবে তালাক দেওয়ার সহজ প্রসেস, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সত্যায়ন এবং আইনি বিষয়সমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
প্রবাসে থেকে তালাক দেওয়ার প্রধান ২টি আইনি পদ্ধতি
একজন প্রবাসী প্রধানত দুইভাবে বাংলাদেশে থাকা স্ত্রীকে আইনগতভাবে তালাক দিতে পারেন:
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (আমমোক্তারনামা) প্রেরণের মাধ্যমে: আপনি দেশে না এসে সম্পূর্ণ প্রবাসে বসেই এই এই তালাকের কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন। আর একটা হলো
ছুটি নিয়ে বাংলাদেশে এসে কিছু দিনের জন্য বাংলাদেশে এসে সরাসরি কাজী অফিসে উপস্থিত হয়ে তালাকের প্রক্রিয়া শুরু করা।
নিচে প্রবাস থেকে বিচ্ছেদের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত ও সহজ পদ্ধতি অর্থাৎ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সংক্রান্ত বিস্তারিত ধাপগুলো তুলে ধরা হলো
।
১. পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রক্রিয়ায় তালাক দেওয়ার ধাপসমূহ
আপনি যদি কোন কারণে দেশে আসতে না পারেন, তবে বাংলাদেশে আপনার কোনো নিকটস্থ এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তিযেমন: আপনার বাবা, ভাই বা অন্য কোনো বিশ্বস্ত আত্মী কে আপনার পক্ষে কাজ করার জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ করতে হবে।
ধাপ ১: পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও তালাকের দলিল প্রস্তুতকরণ
প্রথমেই বাংলাদেশে একজন অভিজ্ঞ পারিবারিক আইন বিশেষজ্ঞ (আইনজীবী) বা রেজিস্টার্ড কাজী সাহেবের সাথে যোগাযোগ করুন। তিনি আপনার ও আপনার স্ত্রীর তথ্য নিয়ে একটি “পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (আমমোক্তারনামা)” এবং একটি “তালাকের নোটিশ/ঘোষণা”-র সঠিক আইনি ড্রাফট তৈরি করে দেবেন।
ধাপ ২: বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে সত্যায়ন
আইনজীবী কর্তৃক ইমেইলে পাঠানো ড্রাফটটি প্রিন্ট করে নিন। এরপর আপনি যে দেশে অবস্থান করছেন (যেমন: সৌদি আরব, ইউএই, মালয়েশিয়া ইত্যাদি), সে দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট অফিসে সশরীরে উপস্থিত হন।
কনস্যুলার কর্মকর্তার উপস্থিতিতে উক্ত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও তালাকের দলিলে আপনাকে নিজে স্বাক্ষর করতে হবে।
কনস্যুলার কর্মকর্তা আপনার স্বাক্ষর সত্য ঘোষণা করে দলিলে অফিসিয়াল সিল ও সত্যায়ন প্রদান করবেন।
ধাপ ৩: ডকুমেন্টস বাংলাদেশে প্রেরণ
দূতাবাস থেকে সত্যায়িত মূল দলিলটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার বা ডাকযোগে বাংলাদেশে আপনার মনোনীত প্রতিনিধির (আমমোক্তার) ঠিকানায় পাঠিয়ে দিন।
ধাপ ৪: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে কাউন্টার সত্যায়ন
বাংলাদেশে আপনার প্রতিনিধি দলিলটি হাতে পাওয়ার পর দুটি সরকারি ধাপ অতিক্রম করতে হবে:
প্রথমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় Ministry of Foreign Affairs – MOFA থেকে কনস্যুলার সেবার মাধ্যমে দলিলটি সত্যায়িত করিয়ে নিতে হবে।
এরপর নিজ জেলার জেলা প্রশাসক (DC Office)-এর রাজস্ব শাখা থেকে নির্দিষ্ট সরকারি স্ট্যাম্প ফি প্রদান করে দলিলের ওপর স্ট্যাম্পিং ও নম্বর সংগ্রহ করতে হবে।
ধাপ ৫: কাজী অফিস ও চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ প্রেরণ
ডকুমেন্টগুলো সম্পূর্ণ লিগ্যালাইজড হওয়ার পর, আপনার প্রতিনিধি একজন রেজিস্টার্ড কাজী বা আইনজীবীর মাধ্যমে দুটি নিবন্ধিত চিঠি পাঠাবেন:
প্রথম চিঠি: আপনার স্ত্রীর বর্তমান বা স্থায়ী ঠিকানায়।
দ্বিতীয় চিঠি: স্ত্রী যে এলাকায় বসবাস করেন, সে এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান / পৌরসভার মেয়র / সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর কার্যালয়ে।
আর পড়ুন – জার্মানি কাজের ভিসা ২০২৬ কিভাবে যাবেন সহজে – খরচ, যোগ্যতা ও আবেদন প্রক্রিয়া
ইতালিতে কৃষিকাজ ও সিজনাল ওয়ার্ক পারমিট ২০২৬ কাজের ধরন ও আয়ের পূর্ণাঙ্গ গাইড
ক্রোয়েশিয়া কাজের ভিসা ২০২৬: বেতন, চাহিদাসম্পন্ন কাজ ও সহজে ভিসা পাওয়ার সম্পূর্ণ গাইড
২. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সনদের তালিকা
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তৈরি এবং আইনি তালাকের কাজ শুরু করার জন্য নিম্নোক্ত কাগজপত্রগুলো প্রস্তুত রাখা আপনার জন্য বাধ্যতামূলক:
স্বামীর ডকুমেন্টস: পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) সত্যায়িত কপি এবং ৪ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
স্ত্রীর ডকুমেন্টস: স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা পাসপোর্টের কপি এবং ২-৪ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
কাবিননামা: মূল নিকাহনামা (কাবিননামা)-র সার্টিফাইড কপি।
মনোনীত প্রতিনিধির (আমমোক্তার) ডকুমেন্টস: যার নামে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিচ্ছেন, তার NID কার্ডের কপি ও ২ কপি ছবি।
৩. ৯০ দিনের ইদ্দতকাল ও তালাক কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া
মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১-এর ৭ ধারা অনুযায়ী, স্থানীয় চেয়ারম্যান/মেয়র অফিসে তালাকের লিখিত নোটিশ পৌঁছানোর দিন থেকে ৯০ দিন (তিন মাস) পর্যন্ত একটি বাধ্যতামূলক সময়সীমা বা ইদ্দতকাল গণনা করা হয়।
সালিশি বৈঠক: নোটিশ পাওয়ার পর উক্ত স্থানীয় কর্তৃপক্ষ স্বামী ও স্ত্রী উভয় পক্ষকে নিয়ে বিষয়টি মীমাংসার জন্য আপোস বা সালিশি নোটিশ পাঠাতে পারেন।
চূড়ান্ত নোটিশ: এই ৯০ দিনের মধ্যে যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পুনরায় কোনো আ্সপো বা মিল না হয়, তবে ৯০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর আইনত তালাকটি চূড়ান্তভাবে তালাক কার্যকর হয়ে যাবে।
ডিভোর্স সার্টিফিকেট অর্জন: ৯০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর কাজি অফিস থেকে অফিসিয়াল “তালাকনামা” বা “Divorce Certificate” প্রদান করা হয়, যা আপনার প্রতিনিধি আপনার হয়ে সংগ্রহ করতে পারবেন।
৪. সংক্ষেপে অন্য উপায়: স্বল্পদিনের ছুটিতে দেশে এসে তালাক দেওয়া এটাই সহজ আপনার
যদি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সত্যায়ন ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে দৌড়াদৌড়ির ঝামেলায় না যেতে চান এবং দ্রুত কাজ শেষ করতে চান, তবে ১-২ দিনের সংক্ষেপিত ছুটিতে দেশে আসাই সবচেয়ে সহজ সমাধান।
প্রসেস:
দেশে পৌঁছে সরাসরি স্থানীয় কাজী অফিসে গিয়ে কাবিননামা ও NID জমা দিন।
কাজীর উপস্থিতি ও রেজিস্টার খাতায় নিজ হাতে সই করে তালাকের নোটিশ ইস্যু করিয়ে প্রবাসে ফিরে যান।
আপনার অনুপস্থিতিতে কাজি সাহেব নির্ধারিত স্থানে নোটিশ পাঠাবেন এবং ৯০ দিন পার হলে আপনার প্রতিনিধি কাজি অফিস থেকে ডিভোর্স সার্টিফিকেট তুলে নিতে পারবেন।
সতর্কতা
দেনমোহর ও খোরপোষের অধিকার: আইনিভাবে তালাক যেভাবেই দেওয়া হোক না কেন, স্ত্রীর বকেয়া দেনমোহর এবং ৯০ দিনের ইদ্দতকালের বড়ণপোষণ পরিশোধ করা স্বামীর আইনি দায়িত্ব। দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রী পরবর্তীতে পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন।
মৌখিক বা মেসেজে তালাক অকার্যকর: ফোনে, ইমেইলে, হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজে বা মুখে ৩ বার “তালাক” বললেই আইনিভাবে বিচ্ছেদ ঘটে না। সরকারি নিয়ম মেনে লিখিত নোটিশ না দিলে পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিয়ে বা অন্যান্য কাজে আপনি বিপদে পড়তে পারেন ।
প্রতারণা থেকে সাবধান: কাগজপত্র তৈরির ক্ষেত্রে কোনো অসাধু দালাল বা ভুয়া কাজীর খপ্পরে পড়বেন না। অবশ্যই রেজিস্টার্ড কাজী অফিস বা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অনুমোদিত আইনজীবীর মাধ্যমে সরকারি নিয়ম মেনে পেপারওয়ার্ক সম্পন্ন করুন।
আইনগত সঠিক পথ অনুসরণ করলে প্রবাসে বসেই সম্পূর্ণ নিরাপদে ও ঝামেলামুক্ত উপায়ে বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব।

