সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান চেনার সহজ উপায় ও অনলাইন যাচাই পদ্ধতি
বাংলাদেশে যেকোনো জমি কেনাবেচা বা স্বত্ব প্রমাণের জন্য খতিয়ান বা পর্চা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি দলিল। ভূমি ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে ইতিহাসজুড়ে বিভিন্ন সময়ে দেশে ভূ-জরিপ পরিচালিত হয়েছে এবং আলাদা আলাদা খতিয়ান তৈরি করা হয়েছে। এই জরিপগুলোর মধ্যে সিএস, এসএ, আরএস এবং বিএস খতিয়ান প্রধান। জমি কেনার আগে কিংবা পৈতৃক সম্পত্তির মালিকানা সুনির্দিষ্ট করতে এই চার ধরনের খতিয়ান সম্পর্কে আপনার স্পষ্ট ধারণা রাখা জরুরি। তা না হলে ভুয়ো বা ভুল খতিয়ানের ওপর ভিত্তি করে জমি কিনে ভবিষ্যতে মারাত্মক আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা থাকে।
আরো পড়ুন –বাংলাদেশে জমি ক্রয়ের পূর্বে সঠিক জমি চেনার উপায় ও আইনি কাগজপত্র যাচাইয়ের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
বাংলাদেশে জমি ক্রয়ের পূর্বে সঠিক জমি চেনার উপায় ও আইনি কাগজপত্র যাচাইয়ের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
প্রথমেই আসে সিএস (CS) বা ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে খতিয়ান। এটি তৎকালীন ভারত উপমহাদেশে ১৮৮৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে পরিচালিত প্রথম বৈজ্ঞানিক জরিপ। সিএস খতিয়ানকে সকল খতিয়ানের মূল ভিত্তি বা ‘মাদার খতিয়ান’ বলা হয়। এই খতিয়ানগুলো সাধারণত লম্বালম্বি কাগজের তৈরি এবং এতে জমির প্রথম রেকর্ডভুক্ত মালিকের নাম ও বিবরণ থাকে। এরপর ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পর প্রস্তুত করা হয় এসএ (SA) বা স্টেট একুইজিশন খতিয়ান। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে দ্রুততার সাথে সিএস জরিপের ওপর ভিত্তি করে এটি তৈরি হয়। এসএ খতিয়ান সাধারণত হাতে লেখা এবং এতে পূর্ববর্তী সিএস খতিয়ানের নম্বর উল্লেখ থাকে।
পরবর্তীতে এসএ খতিয়ানের ভুলত্রুটি সংশোধন এবং সরেজমিনে জমির সঠিক সীমানা নির্ধারণের জন্য আরএস (RS) বা রিভিশনাল সার্ভে শুরু হয়। এই জরিপের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত আরএস খতিয়ান অত্যন্ত নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত। আরএস খতিয়ান চেনার উপায় হলো এটি আড়াআড়ি (Landscape) ফরমেটে মুদ্রিত এবং এতে সাবেক খতিয়ান ও বর্তমান খতিয়ানের স্পষ্ট তথ্য থাকে। সর্বশেষ এবং বর্তমানে চলমান জরিপটি হলো বিএস (BS) বা সিটি জরিপ (যা অনেক স্থানে ডিপি বা বাংলাদেশ সার্ভে নামেও পরিচিত)। ১৯৯৮ সালের পর থেকে শুরু হওয়া এই আধুনিক জরিপে কম্পিউটার প্রযুক্তির সাহায্যে জমির সুনির্দিষ্ট নকশা ও খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার ভূমি সংক্রান্ত সকল সেবা ডিজিটালাইজড করায় ঘরে বসেই অনলাইন থেকে যেকোনো খতিয়ান যাচাই ও খতিয়ানের সত্যায়িত কপি (Certified Copy) তোলা সম্ভব। খতিয়ান অনলাইনে অনুসন্ধান করতে আপনাকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল ই-খতিয়ান পোর্টাল (eporcha.gov.bd)-এ প্রবেশ করতে হবে। সেখানে আপনার নির্দিষ্ট বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও মৌজা নির্বাচন করতে হবে। এরপর সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস জরিপের ধরন বাছাই করে খতিয়ান নম্বর বা দাগ নম্বর দিলে জমির মালিকানা ও খতিয়ানের অনলাইন কপি প্রদর্শন করবে।
জমি লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতিটি জরিপের ধারাবাহিকতা মিলিয়ে দেখা বাধ্যতামূলক। সিএস খতিয়ানের মূল মালিকের নাম থেকে শুরু করে এসএ, আরএস এবং বিএস খতিয়ান পর্যন্ত মালিকানার হাতবদল বা ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির নাম সঠিকভাবে আছে কি না তা যাচাই করতে হবে। খতিয়ানের নাম বা দাগ নম্বরে কোনো মিল না থাকলে অবিলম্বে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা মিসকেস (Miscase) করা উচিত। সঠিক খতিয়ান যাচাই নিশ্চিত করলে ভূমির আইনি অধিকার শতভাগ সুরক্ষিত থাকে।

