জমি রেজিস্ট্রেশনের সকল দলিল কত প্রকার ও কি কি? বিস্তারিত আইনি গাইডলাইন
বাংলাদেশে ভূ-সম্পত্তি ক্রয়, বিক্রয়, দান, বন্টন কিংবা কোনো প্রকার আইনি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ‘দলিল’ (Deed) হলো স্বত্ব প্রমাণের প্রধানতম আইনি ভিত্তি। রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ (Registration Act 1908) অনুযায়ী কোনো স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর বা স্বত্ব ঘোষণার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ফরমেটে লিখিত ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত দলিল ব্যতীত তা আইনিভাবে গ্রহণযোগ্য হয় না। সাধারণ মানুষ জমি কেনাবেচা বা স্বত্ব বাটোয়ারার সময় দলিলের রূপরেখা না বুঝে ভুল দলিল সম্পাদন করে থাকেন, যার ফলে পরবর্তীতে জটিল আইনি বিরোধ ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। তাই সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রকার দলিলের সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা, ব্যবহার ও বৈশিষ্ট্য জানা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে জমি ও স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রধান দলিলের প্রকারভেদগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. সাব-কবলা দলিল
জমি কেনাবেচায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত দলিল হলো সাব-কবলা বা বিক্রয়পত্র। যখন কোনো ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে তার স্বত্বাধিকারী জমি বা সম্পত্তি অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে স্থায়ীভাবে বিক্রি করেন, তখন সাব-কবলা দলিল সম্পাদন করা হয়। এই দলিলের মাধ্যমে ক্রেতা জমির পূর্ণাঙ্গ স্বত্ব, দখল এবং হস্তান্তর করার আইনি ক্ষমতা লাভ করেন।
আরো পড়ুন- ১ শতাংশ জমি কতটুকু? শতাংশ, কাঠা ও স্কয়ার ফিটে জমি পরিমাপের সহজ হিসাব
সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান চেনার সহজ উপায় ও অনলাইন যাচাই পদ্ধতি
জমি নামজারি বা মিউটেশন কি? অনলাইনে ই-নামজারি আবেদনের সঠিক নিয়ম
২. দানপত্র দলিল
কোনো প্রকার অর্থ বা বিনিমূল্য ছাড়া স্বেচ্ছায় এবং সানন্দে কাউকে জমি দান করার মাধ্যম হলো দানপত্র দলিল। যেকোনো ব্যক্তির নামে এটি করা যায়। তবে গ্রহীতা এই দান গ্রহণ না করলে বা দাতার জীবদ্দশায় দখল হস্তান্তর না হলে আইন অনুযায়ী দানপত্র বাতিল বলে গণ্য হতে পারে।
৩. হেবা দলিল
মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী নিকটতম রক্তসম্পর্কিত আত্মীয়দের (যেমন: স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা-সন্তান, ভাই-বোন, দাদা-দাদী ও নাতি-নাতনী) মধ্যে কোনো বিনিময় ছাড়া ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ জমি হস্তান্তরের জন্য হেবা দলিল সম্পাদন করা হয়। এর অন্যতম বড় সুবিধা হলো এর সরকারি রেজিস্ট্রেশন খরচ অত্যন্ত কম।
৪. হেবা বিল এওয়াজ দলিল
সাধারণ হেবা দলিলের সাথে এর পার্থক্য হলো—এটি কোনো ধর্মীয় বস্তু (যেমন: কুরআন শরীফ, তসবিহ, জায়নামাজ) বা কোনো উপহার বা মোহরানার বিনিময়ে সম্পাদন করা হয়। বিনিময়ে কোনো জিনিস বা প্রতীকী বস্তু গ্রহণের কথা দলিলে স্পষ্টভাবে উল্লিখিত থাকে। আমি আপনাকে একটা আইফোন ১৭ দিব আপনি আমাকে ১০ শতাংশ জায়গা লিখে দিবেন ।
৫. এওয়াজ দলিল
দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে নিজেদের জমির পারস্পরিক অদলবদল করার জন্য যে দলিল সম্পাদন করা হয়, তাকে এওয়াজ বা বিনিময় দলিল বলে। যেমন—একজন ব্যক্তি তার কোনো দূরের জমি অন্য কারও কাছাকাছি জমির সাথে সমান মূল্যে অদলবদল করে নিলে এই দলিল ব্যবহার করতে হয়। মনে করেন আপনার জমির পাশে অন্য জনের জমি আর তার বাড়ির পাশে আপনার জমি এই ক্ষেত্রে আপনি অদল বদল করতে পারবেন তার টা আপনি আপনার টা তাকে লিখে দিবেন এইটাই এওয়াজ দলিল আর যদি জমির পড়িমান কম বেশি হয় যার বেশি তাকে সেই পরিমাণ টাকা দিয়ে দিবেন ।
৬. বন্টননামা দলিল
পৈতৃক বা যৌথ মালিকানাধীন সম্পত্তি সহ-শরিকদের মধ্যে আপস-রফায় নিজেদের নির্দিষ্ট অংশ পৃথক করার জন্য বন্টননামা দলিল সম্পাদন করা বাধ্যতামূলক। যৌথ সম্পত্তি রেজিস্টার্ড বন্টননামা ছাড়া কেনাবেচা বা একক নামে নামজারি করা যায় না। যেমন আপনার বাবার জমি বিক্রি করবেন আপনাদের ভাই বোন ৪ জন সবার অনুমতি লাগবে ।
৭. ওসিয়তনামা দলিল
কোনো মুসলিম ব্যক্তি তার জীবদ্দশায় মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির বিলিবণ্টন বা কাউকে নির্দিষ্ট অংশ দেওয়ার জন্য যে লিখিত আইনি ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তাকে ওসিয়তনামা বলে। নিয়ম অনুযায়ী একজন ব্যক্তি তার মৃত্যুর পূর্বে মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ ১/৩ অংশ (এক-তৃতীয়াংশ) পর্যন্ত ওসিয়ত করতে পারেন। যেমন আপনার বাবা মারা যাওয়ার আগে মসজিদে বা মাদ্রাসায় ৫ শতাংশ জায়গা দিবে বলছিল কিন্তু এর আগেই উনি মারা যান এটা দিতে হলে এই দলিল হবে।
৮. উইল দলিল
হিন্দু বা অমুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে মৃত্যুর পর সম্পত্তি হস্তান্তরের লিখিত অধিকার প্রকাশকে উইল বলা হয়। তবে উইলের ক্ষেত্রে দাতার মৃত্যুর পর তা কার্যকর করার জন্য আদালত থেকে প্রবেট সনদ নিতে হয়, অন্যথায় এটি আইনিভাবে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় না।
৯. না-দাবি দলিল
কোনো যৌথ সম্পত্তি বা সম্পত্তিতে নিজের আইনগত কোনো অধিকার বা স্বত্ব রয়েছে এমন ব্যক্তি যখন কোনো অর্থ বা শর্ত সাপেক্ষে বা নিঃশর্তভাবে তার সেই স্বত্ব সম্পূর্ণ ত্যাগ করেন এবং ভবিষ্যতে দাবি করবেন না বলে চুক্তি করেন, তাকে না-দাবি দলিল বলে।
১০. বন্ধকী দলিল
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান (যেমন ব্যাংক) থেকে ঋণ গ্রহণের সময় জামানত হিসেবে জমি বা সম্পত্তি দায়বদ্ধ রাখার জন্য যে দলিল সম্পাদন করা হয়, তা হলো বন্ধকী দলিল। ঋণ পরিশোধ হলে বন্ধকী দলিল রদ বা বাতিল ঘোষণা করা হয়।
১১. বয়নামা দলিল
আদালত বা সরকারি কোনো সংস্থা কর্তৃক নিলামে কোনো জমি বিক্রি হলে, নিলামে জয়ী সর্বোচ্চ দরদাতাকে যে অফিসিয়াল মালিকানার দলিল বা সনদ প্রদান করা হয়, তাকে বয়নামা বলে।
আইনসম্মত উপায়ে জমি লেনদেনের জন্য সঠিক দলিল বাছাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অসাধু চক্র বা ভুল আইনি পরামর্শ থেকে বাঁচতে যেকোনো দলিল রেজিস্ট্রেশন করার আগে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা অভিজ্ঞ দলিলের খসড়াকারীর (দলিল লেখক) মাধ্যমে জমির বায়া দলিল ও আরএস/বিএস খতিয়ান যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

