প্রবাস জীবনের অন্ধকার দিক
একটা প্রবাসি যখন নিজের দেশ ছেড়ে দেশের মায়্যা ত্যাগ করে বিদেশের মাটিতে এসে যখন কাজ করে, তখন দেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনরা শুধু মাত্র তার পাঠানো টাকা আর সুন্দর সুন্দর ছবিগুলোই দেখেন। কিন্তু এই কজের আড়ালে প্রবাসীদের জীবন যে কতটা কষ্ট , তা সবসময় লুকিয়েই থেকে যায়। বিদেশের মাটিতে একজন প্রবাসীকে প্রতিদিন শারীরিক, মানসিক এবং আইনি ভিবিন্ন অসুবিধার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা প্রবাসীদের জীবনের প্রধান যে অসুবিধা সেইগুলো নিয়ে আলোচনা করব।
১. অসহ্য একাকীত্ব ও পরিবারহীনতা
প্রবাস জীবনের সবচেয়ে বড় একটা অসুবিধার নাম হলো একাকীত্ব। বিদেশে আপনার নিজের কোন চেনা পরিবেশ, বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান ছেড়ে হাজার মাইল দূরে একা থাকা মোটেও কিন্তু সহজ কাজ নয় একজন প্রবাসি সেই একাকিত্ব এর মধ্যে থাকে । যদি আপনি বিদেশে এসে অসুস্থ হইয়ে যান সেই অসুস্থতার সময় তখন এক গ্লাস জল দেওয়ার মতো আপন কেউ পাশে থাকে না, এর নাম ই প্রবাস । তখন বিদেশের সেই কষ্টের কথা দেশ থেকে কেউ চিন্তা ও করতে পারে না। বিশেষ করে ঈদের মতো ধর্মীয় উৎসবগুলোতে প্রবাসীদের চোখের জল ঘরের কোণেই শুকিয়ে যায়। বাবা মা আত্বিয় সজ্বন বন্ধু বান্ধব ছাড়া প্রত্যেক টা ঈদ কাটাতে হয় আর সেই একাকিত্ব একজন প্রবাসি শুধু ভুঝে ।
২. প্রতিকূল আবহাওয়া ও পরিবেশ
আপনি যদি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যেমন সৌদি আরব বা দুবাইয়ে যান সেখানে তাপমাত্রা অনেক সময় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর বেশি ছাড়িয়ে যায়। এই প্রচণ্ড রোদে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শরীরের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। আবার ইউরোপ বা আমেরিকার দেশগুলোতে হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যে কাজ করতে হয়। এই আবহাওয়ার পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে অনেক প্রবাসী দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত হন। আর যার পাশে তখন কেউ থাকে না । না থাকে বাবা মা, না থাকে ভাই বো্ পুরা একা অসুস্থতার সাথে যুদ্ধ করতে হয়।
৩. অমানবিক পরিশ্রম ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা
অনেক প্রবাসীকেই দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। অনেক সময় ওভারটাইমের আশায় বা টাকা বেশি ইনকাম করার আশায় তারা নিজের শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করেন শরীরের কোন চিন্তা করে না চিন্তা করে ফ্যামিলির যে ৫ লাখ ১০ লাখ টাকা খরচ করে ঋণ করে বিদেশে আসা। পর্যাপ্ত ঘুম এবং বিশ্রামের অভাবে তারা ধিরে ধিরে অসুস্থর দিকে এগিয়ে যান যা তারা নিজেও জানে না । অনেক ক্ষেত্রে ভালো ঘুমানোর জায়গা বা ভালো মানের খাবারের অভাবও তাঁদের কপালে জোটে না ।
৪. ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা
বিদেশে যাওয়ার পর প্রথম যে বড় সমস্যাতে প্রবাসীরা পড়ে , তা হলো ভাষা শিক্ষার কারণে। নিজের মনের কথা অন্যকে বোঝাতে পারে না ঠিকমতো বুঝতে না পারার কারণে কাজের কাজের ক্ষেত্রে অনেক সময় অপমানিত হতে হয়। তাই যারা বিদেশে যাবেন যে দেশেই যান না কেনো ভাষা নিত্য প্রইয়োজনীয় বাক্য গুলা শিখে যাবেন । এছাড়াও বিদেশের ভিন্ন সংস্কৃতির সাথে খাপ খাওয়ানো অনেক সময় মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৫. আইনি জটিলতা ও দালালের প্রতারণা
বাংলাদেশে দালাল এর অভাব নেই অনেক প্রবাসী দালালের মাধ্যমে ভুল ভিসায় বা “ফ্রি ভিসায়” বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়েন। আকামা (Iqama) নবায়ন না হওয়া, কফিলের সমস্যা কফিল ভালো হয় না ‘হুরুব’ প্রাপ্ত হওয়া কিংবা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার ভয় তাঁদের ভিতরে সবসময় তাড়া করে বেড়ায়। আইনি কাগজপত্রের সামান্য ভুলের কারণে বছরের পর বছর জেল খাটা বা নিঃস্ব হয়ে দেশে ফেরার ঘটনাও অনেক আছে ।
৬. বেতন বাকি ২ মাস ৩ মাস
অনেক সময় দেখা যায় মাসের পর মাস এত খাটুনি খাটলেও কোম্পানি বা কফিল ঠিকমতো বেতন দিচ্ছে না। বিশেষ করে সারা সাপ্লাই কম্পানি তে কাজ করে বা ফ্রি ভিসাতে গিয়ে সাপ্লাই এর অধিনে কাজ করে তাদের বেতন ২ মাস ৩মাস করে আটক করে দেই টাকা দেই না ঘুড়াই টাকা নিয়ে অনেক প্রবাসি কথা । আবার অনেক কফিল প্রবাসীদের আকামা রিনিউ করার নামে অনেক টাকা হাতিয়ে নেয়। নিজের এত কষ্টের ঘাম ঝরানো টাকা যখন অন্য কেউ অন্যায়ভাবে প্রতারণা , তখন সেই কষ্টের সীমা থাকে না।
৭. সামাজিক ও মানসিক অবমূল্যায়ন
অনেক সময় নিজের দেশের মানুষ বা পরিবারও প্রবাসীদের কোন মূল্যান করে না দাম দেই না । পরিবারের কাছে প্রবাসী মানেই যেন ‘টাকা বানানোর মেশিন’ প্রবাসে আসবে আর বস্তা বস্তা টাকা পাটাবে সে এখানে কি করছে কেমন দিন যাচ্চে ভালো না খারাফ শরিল সাস্থ ভালো কি না সেইগুলো দেখবে না । তার শরীর খারাপ বা মনের কষ্টের চেয়ে তার পাঠানো টাকার দাম তখন বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন একজন প্রবাসী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। যে কার জন্য করতেছি এত কষ্ট ।
উপসংহার
প্রবাস জীবন মানেই রঙিন স্বপ্ন নয়, বরং এটি ত্যাগের এক বিশাল কাহিনি । এই সব অসুবিধা থাকার পড়েও প্রবাসীরা লড়াই চালিয়ে যান শুধু তাঁদের প্রিয়জনদের একটু ভালো রাখার জন্য তাদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য। “প্রবা গাইড” এর লক্ষ্য হলো প্রবাসীদের এই সব প্রতিকূলতা মোকাবিলায় সঠিক তথ্য দিয়ে পাশে দাঁড়ানো। আমরা বিশ্বাস করি, প্রবাসীদের এই ত্যাগ ও শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হওয়া জরুরি।

